Monday, April 27, 2026

বঙ্গ রাজনীতি – এপ্রিল ২০২৬ – দ্বিতীয় পর্ব

প্রথম লেখার Link

ওপরের লেখাটার লিঙ্ক facebook-এ দেওয়ার পর, কিছু মন্তব্য এসেছিল। তাই আমার মনে হয়েছে, আমার ধারণা গুলো পরিস্কার করে আর একটা লেখাতে লিখে রাখলে, আমারই সুবিধা হবে।

বাম রাজনীতিতে বিশ্বাস করে আন্তরিক ভাবে কাজ করা দুই সৈনিকের পরিচয় পেয়েছি। একজন ত্রিপুরা-র আর একজন পশ্চিমবঙ্গের। উল্লেখ্য, দুই রাজ্যেই বাম দল অনেকদিন ধরে রাজত্ব চালিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের যে ভদ্রলোকের (দীপক শীল) কথা বলছি, কলকাতার বিভিন্ন থিয়েটারে নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে থাকতে, তিনি দীর্ঘ তিন দশক বাম রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। কর্মসূত্রে, একটি জুট মিলের সঙ্গেও জড়িয়ে ছিলেন। পরে পরিস্থিতি এবং সময়ের প্রয়োজনে তাঁকে অন্য কাজের মধ্যে জড়িয়ে পড়তে হয়। বেশ কিছুদিন আলাপের পর (একটি সান্ধ্যকালীন পাঠচক্রের মাধ্যমে), কৌতুহল বশতঃ তাঁকে নানাধরণের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করি। উদ্দেশ্য, যেহেতু জীবনের অনেকটা পথ তিনি চলে ফেলেছেন (ওনার বয়স তখন ৮৬-৮৭), তাঁর থেকে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য একটা কি দুটো পথনির্দেশ পাওয়া যাবে। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারি, উনি বাম রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় ভাবে যুক্ত ছিলেন। জিজ্ঞাসা করলাম, “বাম” মতবাদ বা আদর্শ নিয়ে আপনি কি ভাবেন – তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন ওগুলো মানুষকে বিভ্রান্ত করে। শ্রীরামকৃষ্ণ, মা সারদা ও স্বামী বিবেকানন্দ যে পথ বলে দিয়েছেন বা দেখিয়ে দিয়েছেন, সেটি ধরতে পারলে, জীবনে শান্তি পাবে, ভালোভাবে থাকতে পারবে। অবাক হয়ে শুনেছি, কারণ নিজের চোখেই দেখেছি, যারা রাজনীতি নিয়ে থাকেন, তারা তাতে বুঁদ হয়ে থাকেন – এতটা ডুবে থাকেন, যে নিজের জন্যও পাঁচ মিনিট সময় বার করতে পারেন না। মানুষের সেবার জন্য হোক বা সেই ভাব-হেতু হোক। তাঁর মধ্যে এতটা পরিবর্তন কিভাবে?? দীপকবাবু, শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবধারায় আসেন বিখ্যাত বেতার সংগীতশিল্পী, শ্রী অরুণকৃষ্ণ ঘোষ মহাশয়ের হাত ধরে। যেহেতু দীপক বাবু নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করতেন এবং তাঁর কন্ঠে একটা মাদকতা ছিল, অরুণকৃষ্ণ বাবু তাঁকে গীতি আলেখ্যয় কণ্ঠদানের জন্য অনুরোধ করেন। সেই শুরু – তারপর থেকে নানা অনুষ্ঠানের সুবাদে, তিনি ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরেছেন এবং তাঁর গ্রন্থনা নানা সংকলন এবং কণ্ঠ দিয়ে ভক্তমন্ডলীদের আনন্দ দিয়েছেন। মানুষ সাধারণতঃ তার কাছেই যায় বা থাকে, যার কাছে ভালোবাসা পায়। দীপক বাবু মনে হয় দ্বিতীয় জায়গায় বেশি ভালোবাসা পেয়েছিলেন – বা দেখেছিলেন, যা তাঁর দর্শনে পরিবর্তন আনে।

আর দ্বিতীয় যে ভদ্রলোকের (শ্রী চক্রবর্তী) কথা বলছি, তিনি আগরতলার। তাঁর কন্যার সঙ্গে আমার বিশেষ পরিচিতি। উল্লেখ্য, তিনিও বাম রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং নেতা মন্ত্রীরাও তাঁর বাড়িতে যাতায়াত করতেন। কন্যার মুখেই শুনেছি, তাঁর বাবা, যেহেতু বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, তিনি পরে যখন ঈশ্বরদর্শন করতেন, বাম হাতে মাথা ঠুকতেন। কেননা তিনি ডান হাতে রাজনীতি করেছেন। (কোথাও কি চাঁদ সদাগরের কাহিনী মনে পড়ছে। মনসা দেবীকে বাম হাতে পুষ্প অর্পণ করেছিলেন।) এখানে, কি কারণে তাঁর দর্শনে পরিবর্তন এসেছিল, সেটি আমার কাছে এখনো পরিস্কার নয়। হয়তো সময়ের সাথে জানতে পারবো। যাইহোক, দর্শন যাইহোক না কেন, মানুষকে তার যথাযথ সম্মান দিতে হবে বৈকি। মানুষ হিসেবে সম-মান যদি না দিতে পার, তুমি কিসের মানুষ হে?

আর একটি দুটি ঘটনা উল্লেখ করবো।

বেলপাহাড়ি – একটি সংস্থা-র (রক্ষাবন্ধন ফর এডুকেশন) হয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষা উত্তীর্ণ দুঃস্থ তথা মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি দেওয়াকে কেন্দ্র করে verification-এ বেলপাহাড়িতে (শিলদা) গিয়েছিলাম ২০০৭-৮ সাল হবে। খড়্গপুর থেকে যাতায়াতের জন্য সীমিত সংখ্যক বাস (সারাদিনে ২টো কি ৩টে হবে – যতদূর মনে পড়ছে – আমার information ভুল হতে পারে – কেউ তথ্য দিয়ে সাহায্য/প্রমাণ করলে আমি আনন্দের সঙ্গে ভুল স্বীকার করবো) – রাস্তার ওপরে দোকান পাট নেই বললেই চলে –– এগুলো থাক – যেটা দেখে মনের মধ্যে প্রশ্ন উঁকি দিয়েছিল – একটি সরকার দীর্ঘ ৩ দশকেরও ওপর রাজত্ব করছে – অথচ একটা দীর্ঘ এলাকার (বিশেষ করে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বিস্তৃত অঞ্চল) উন্নয়ন চোখে পড়ছে না – এলাকার সাধারণ মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। তাদের শারীরিক ভাষা – কোথাও যেন তাদের এখনো ভিখারী করে রেখেছে। মানুষ কিসের জন্য তাহলে এত বছর ভোট দিয়ে গেছে এই সরকারকে? সেই প্রশ্নের উত্তরে আমার মনে হয়েছে – যে নিশ্চয়ই ভয় দেখানো হয়েছে বা ভোটের আগে পেট ভরে খাওয়ানোর লোভ দেখানো হয়েছে – নয়তো কিভাবে সম্ভব?

লবণ সত্যাগ্রহ স্মারক স্টেশন (পাঁশকুড়া – দীঘা লাইন) – (বেশ কয়েকবছর আগে – বছর ৪-৫ তো হবেই – আরো বেশি হতে পারে) স্টেশনে পৌঁছোতে গিয়ে রাস্তায় জল। কোনোভাবে প্লাটফর্মে পৌঁছে, দুই তিন জন সেই কথাই বলছিলেন – পাশে থেকে একজন বিরক্ত স্বরে বলে উঠলেন – কেন্দ্রে বিজেপি সরকার কে এনেছেন, রাজ্যে তৃণমূল সরকার কে এনেছেন – এর থেকে আর কি ভালো হবে! বাম আমলে এত কষ্ট মানুষ পেয়েছে? অবাক হয়ে গিয়েছিলাম – এই লাইনে লোকাল ট্রেন চালু হয়েছে ২০০৪ সালের দিকে। আর ১৯৬৮ সালে এর প্রস্তাবনা। যাইহোক, স্থানীয় অসুবিধায়, স্থানীয়দেরই তো সক্রিয় হয়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে – যেখানে এক গাড়ি ইট (ভাঙা ইট হলেও চলে)/ দুই গাড়ি বালি হলে, সাধারণ যাত্রীদের সুবিধা হয়, সেখানে উপায় না করে, কাদা ছোঁড়াছুঁড়িতেই দিন কেটে যায়... । তাঁর মুখে তাঁর দলই শ্রেষ্ঠ, বাকি সব দল কোনো কাজের নয় – এই কথা বেশ কিছুক্ষণ শোনার পর, প্রতিবাদ করতে বাধ্য হলাম। বললাম সব দলই কিছু না কিছু কাজ করে এলাকা, রাজ্য তথা দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছে – তার কয়েকটা উদাহরণও দিলাম। আর তার দলের কিছু চিত্র ধরে তুললাম। বেলপাহাড়ি-র চিত্রটাও তুলে ধরলাম। ৩-৪ মিনিট – বেশি বলতে হয়নি – ভদ্রলোক ভদ্রভাবেই স্থান ত্যাগ করলেন।

যাইহোক, বর্তমানে, বাম রাজনীতিতে কিছু যুবক-যুবতী বেশ সক্রিয় ভাবে যুক্ত। যা দেখে ভালো লাগে – নতুন গান বাঁধছে, নতুন সুর করছে, কিন্তু তারা অন্যের খারাপটাই বেশি দেখতে শিখেছে এবং নিজেদের কেবল ভালোটাই বলতে শিখেছে – অন্যের ভালোটা দেখে, ভালোটা নিয়ে, নিজের ভালো করে চলা – এটিতে যতক্ষণ না জোর দিতে পারছে – ততক্ষণ দলটি রাজ্যকে কতটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তা নিয়ে আমি যথেষ্ট সন্দিগ্ধ। আর যেটা মনে হয়, একটা দেশকে বা দলকে যদি অন্য দেশের দর্শন ধার করে নিয়ে চলতে হয়, তাও ভারতবর্ষের মত দেশের দর্শন, তবে সেই দল কখনো ভারতবর্ষকে তার শ্রেষ্ঠত্বে পৌঁছে দিতে পারবে না।

রবীন্দ্রনাথ নিজে বলেছেন/লিখেছেন – ভারতবর্ষকে জানতে হলে বিবেকানন্দ পড়। আমার কেন জানি মনে হয়, প্রত্যেক ভারতীয়ের বিবেকানন্দের “আমার ভারত, অমর ভারত” (ইংরেজিতে “My India, India eternal”) বইটি পড়া উচিৎ। চার বছর ধরে পদব্রজে, যে মানুষটি ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরেছেন, এবং নিজের চোখে দেখেছেন এবং বুঝেছেন – তাঁর ভারতবর্ষ নিয়ে কি বক্তব্য, সেটি জানতে ক্ষতি কি?

আবারো বলি, আমার প্রথম লেখায় যে জায়গাতে আমি জোর দিতে চেয়েছিলাম - সাধারণ মানুষকে যথাযথ ভাবে নিষ্ঠার সাথে সেবা দেওয়া হোক। তাতে বর্তমান দল আমার মতে ভালো কাজ করতে পারেনি। তাই পরিবর্তন চেয়েছি। আর আজ যা লিখলাম, তা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কাউকে আঘাত করার অভিপ্রায় নিয়ে আমি লিখি না। আমরা নিজেদের উন্নতির মাধ্যমে নিজেদের কোথায় এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি, আমি সেই সন্ধানেই থাকি। আপাতত, রাজনীতি নিয়ে লেখাতে ক্ষান্ত দিলাম।

সকলে ভালো থাকুক, এই প্রার্থণা ঈশ্বরের কাছে রাখি।

No comments: