Friday, April 17, 2026

বঙ্গ রাজনীতি – এপ্রিল ২০২৬

রাজনীতির ছাই বুঝি – তবু রাজনৈতিক অস্থিরতা মনকে বিচলিত করে। রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে মানুষকে বোকা বানাতে কার্পণ্য করে না। পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ বিধানসভা ভোট – ২৩ ও ২৯ এপ্রিল। ভোট যত এগিয়ে আসছে তত কাদা ছোড়াছুঁড়ি প্রবল হচ্ছে। মানুষের ভোট পেয়ে সরকারে একটা দল আসে – কিন্তু মানুষকে সেবা দেওয়ার সময় মনে করে তারা মানুষকে করুণা করছে। আমার নিজস্ব কিছু মতামত আমি নিজের জন্যই লিখে রাখলাম।

তৃণমূল কংগ্রেস দল, যেটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে তৈরী হয়েছে, সেটি পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসেছিল দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম রাজত্ব্বের অবসান ঘটিয়ে। অনেক আশা নিয়ে পরিবর্তন এনেছিল পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। তাঁর সরকার নিশ্চয়ই কিছু কাজ করেছে – কেননা পরের দুইবার অর্থাৎ ২০১৬ সালে এবং ২০২১ সালেও পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তাঁর দলকে সরকারে বসিয়েছে। তাঁর সরকারের মাধ্যমে রাজ্যে যতটা উন্নয়ন দেখা গেছে তা কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, স্বাস্থ্য সাথী, লক্ষ্মী ভাণ্ডার, ইদানীং যুবশ্রী, ইত্যাদি বলে আমার মনে হয়। কোনো জায়গার বা রাজ্যের উন্নতির প্রথম মাপকাঠি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে। সেইদিক দিয়ে সবুজ সাথী, কন্যাশ্রী, স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট-কাম-মিন্স বৃত্তি, ইত্যাদি প্রকল্পের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের সুবিধে হয়েছে বলে মনে হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে অনলাইনে ভালো ভালো লেখা ভিডিও দেখে পড়াশুনা করতে পারে, বা পড়ার সুযোগ পায়, সেইহেতু মোবাইল ফোন/ট্যাব কেনার আর্থিক সংগতিও দেওয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই কিছু ছাত্র-ছাত্রীদের উপকার হয়েছে – কত সংখ্যক ছাত্রছাত্রীদের উপকার হতে পারে – ১০%? এদিকে স্বাস্থ্যসাথীর জন্যও কিছু মানুষের যে উপকার হয়েছে, তা আমি নিজের চোখে দেখেছি। যে চিকিৎসা ব্যবস্থা সাধারণের আয়ত্ত্বের বাইরে, সেই ব্যবস্থা সাধারণ মানুষকে পেতে দেখেছি।

তবে রাজ্যের সাধারণ নাগরিক হিসেবে পরিবর্তন চাইছি। দুটো বিশেষ কারণে – সেও শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য। যে শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষকদের সম্মান দিতে পারে না, ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার প্রতি আকর্ষিত করতে পারে না – সেই শিক্ষা ব্যবস্থাতে অবশ্যই প্রশ্নচিহ্ন থাকছে। ২৬ হাজার চাকরি – ২৬ হাজার যুবক যুবতীর মন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে – দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। আমরা যারা এইরকম অনিশ্চয়তার পরিস্থিতির মধ্যে জীবনের কোনো না কোনো সময় কাটিয়েছি, তারা জানি এই উৎকণ্ঠা নিয়ে থাকা কি নিদারুণ কষ্টকর। কেন এই ভোগান্তি পোয়াতে হবে রাজ্যের প্রতিশ্রুতিমান যুবক-যুবতীদের? টাকা নিয়ে চাকরি? শিক্ষাকে সামনে রেখে অশিক্ষার চূড়ান্ত নিদর্শন? এবং যখন চোর হাতে নাতে ধরা পড়েছে – তাকেও আশ্রয় দেওয়া? এমন ব্যবস্থা যেমন একটা পরিবারের ছেলে মেয়েদের ভালো করতে পারে না – তেমনি একটা দলকেও তার দায়িত্ত্ব নিতে হবে। ক্ষমা স্বীকার করতে হবে। দম্ভ নিয়ে কত রাজা-ই তো আজ ইতিহাসের পাতায় – এই দলের দম্ভকেও ইতিহাসে স্থান দেওয়া প্রয়োজন – দম্ভ শেষে আবার ফিরে আসুক – তখন দেখা যাবে। এই দলের নেতাদের মধ্যে কিছু নৈতিকতার পঠন পাঠনের ব্যবস্থা আছে বলে কখনো মনে হয়নি। আমায় স্নেহ করেন এমন একজন বেশ কয়েক বছর আগে বলেছিলেন, একজন Director General of Police (DGP) তাঁকে জানিয়েছিলেন যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা পরিচালক যদি চান রাজ্যে চোর ডাকাত থাকবে না, তাহলে চোর ডাকাত থাকবে না।

শিক্ষা-র বেহাল পরিস্থিতির একটা চিত্র ধরা হল – এবার স্বাস্থ্যে আসি। আর জি কর যে ঘটনার সাক্ষী থেকেছে – তার বিচার চাই। জুনিয়র ডাক্তারদের যে হেনস্থা করা হয়েছে – তার বিচার চাই। এইটুকুর উত্তর পেলেই যথেষ্ট। একজন ডাক্তারকে (যাকে কি না সাধারণ মানুষ ঈশ্বরের পরে স্থান দিয়ে এসেছেন) কেন এই মর্মান্তিক পৈশাচিক মৃত্যুবরণ করতে হল – তার উত্তর দিতেই হবে। মুখে যদি না দাও – তাহলে তৈরী থাকো জনগণের দরবারে বিচার পাওয়ার। অবশ্য মানুষ কি যে চায় – তা বোঝা বড় কঠিন ...

মোদ্দা কথা – বিচার চাই। যে মানুষের আস্থায় তুমি সিংহাসনে বসে আছো – সেই মানুষকে এত অবহেলা?? মুখেই মা-মাটি-মানুষ?? মায়ের মেয়েদের সুরক্ষা নেই, বিচার নেই,- মাটির প্রতি শ্রদ্ধা নেই (শিল্প কোথায়? যুবক যুবতীরা ভিন রাজ্যেই বেশি সুখে রয়েছে...) আর মানুষকে ভিখারী-র পর্যায়ে নামিয়ে এনেছ – চাকরি কোথায়? সম্মান কোথায় (শ্রী-র নামে ভিক্ষা দিয়ে)??

দ্বিতীয় দল – ভারতীয় জনতা পার্টি (বি জে পি)
দলের manifesto দেখলাম। তাদের manifesto কোনো দিন সত্য হয়নি। ত্রিপুরাতেও দেখা গেছে – ইদানীং লাদাখে খুব ভালোভাবে দেখা গেছে – কেন না বিজ্ঞানী সোনাম ওয়াংচুকের মত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিরা যখন সেই প্রতিশ্রুতির প্রতি বিচার চেয়েছেন – তখন তাঁর এবং সেইখানকার বাসিন্দাদের প্রতি যে অমানবিক (কেউ কি এখানে প্রশ্ন তুললেন - রাজনীতিতে আবার মানবিক হওয়া যায় নাকি?) ব্যবহারের প্রদর্শন হয়েছে – তা আর যাইহোক একটি গৃহের পক্ষে (পড়ুন দেশের পক্ষে বা দলের পক্ষে) সুখকর নয় – সেই গৃহের গৃহকর্তাকেও এর দায় নিতে হবে। আমার বারংবার মনে হয়েছে একটা গৃহ কেমন হবে তা অনেকটাই গৃহিণী বা গৃহকর্তীর ওপর বর্তায় – গৃহকর্তী যদি না ঠিক হয়, সংসার ভেঙে যায় (এখন বুঝে নিন, এই দলের ক্ষেত্রে কার কথা বলা হচ্ছে – সমঝদারোন কে লিয়ে ইশারা হি কাফী হোতা হ্যায়)। অনেক সময়ই আমার মনে হয়েছে তাঁর ওই ঔদ্ধত্য তাঁর দলকেই পিছিয়ে দিচ্ছে। যে দলকে অটল বিহারী বাজপেয়ীর মত ব্যক্তিত্ব একটা শক্ত ভীতের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। আদর্শ যখন ব্যক্তি ছাড়িয়ে বিষয় হয়, তখন বিষয়ের মোহ আদর্শকে যথাযথ সময় বা শ্রদ্ধা দিতে পারে না – আদর্শকে ভুলিয়ে দেয়।

আর যে দল মনের মধ্যে আসছে – বাম দল। যে দেশকে (ভারতবর্ষের মত দেশকে) পরিচালনা করার জন্য অন্যদেশের থেকে দর্শন ধার করতে হয় – সেই দল আর যাইহোক দেশের উন্নতিতে খুব সাঙ্ঘাতিক একটা অবদান রাখতে পারে বলে আমি অন্তত বিশ্বাস করতে পারছি না। জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য মানুষের জন্য কাজ করার চেষ্টা করেছেন – কিন্তু নিজের দলের মধ্যেই ক্ষমতার ঔদ্ধত্যের স্থান দিয়েছেন – তাই একটা সময় পরে ভরাডুবি – অবশ্য তিন দশকে একটা পরিবর্তন হয়েছে । ভারতীয় এক মহাপুরুষের কথায় মানুষ বা জাতি বা দেশ যদি তার নিজস্ব সহজাত প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে কাজ করে – সে কখনো তার শ্রেষ্ঠত্বে পৌঁছোতে পারে না – অর্থাৎ ভারতবর্ষ যদি তার সহজাত প্রকৃতি থেকে বেরিয়ে অগ্রসর হতে চায়, তা চলার পথে ব্যাঘাত ঘটাবে। এখন প্রশ্ন ভারতের সহজাত প্রকৃতি কি? ভারতবর্ষ পৃথিবীর মানচিত্রে কিসের জন্য বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে? পাঠক/পাঠিকা’র উত্তর কি?

বর্তমানে কংগ্রেস দলের যা অবস্থা, সেই দলের কথা আর নাই বা লিখলাম।

আগেই বলেছি, প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলই এক অপরের প্রতি কাদা ছুঁড়ছে। এখন প্রতিযোগিতা হচ্ছে কে কত নিজেদের বড় দেখাতে পারে/ কে কত ভালো দেখাতে পারে – এবং এই বড় বা ভালো দেখাতে গিয়ে অন্যকে ছোট/খারাপ দেখাতে হচ্ছে – মজার ব্যাপার, কেউই ধোয়া তুলসী পাতা নয়। তাহলে অন্যের খারাপ দিকটার দিকে না আঙুল তুলে নিজেদের নিজেদের যে শক্তি সেই দিকে জোর দাও না! ওতে দলের ভালো হবে, মানুষের ভালো হবে, রাজ্যেরও ভালো হবে --- সাধারণ মানুষ ভালো কিছু জানতে পারবে, দেখতে শিখবে, এবং সর্বোপরি একটা positive ভাব থাকবে --- অবশ্য তখন কি সেটাকে “রাজনীতি” বলা যাবে?? জানি না --- মনের ভাব প্রকাশ করলাম মাত্র।

মানুষের জয় হোক! মানবতার জয় হোক!

Thursday, April 16, 2026

শুভ নববর্ষ ১৪৩৩

২রা বৈশাখ, ১৪৩৩; ১৬ই এপ্রিল ২০২৬ সাইটসোপেন, সোহরা, চেরাপুঞ্জি, মেঘালয় - ৭৯৩১০৮

শুভ নবশুভ নববর্ষ ১৪৩৩ !!

বছরের নতুন দিন। নতুন বছরে নতুন আশা নিয়ে আমরা পা দিলাম।

দিন যত যায়, বাঙালী হিসেবে গর্ব অনুভব করি। বীর সুভাষচন্দ্র,বাঘা যতীন, ক্ষুদিরাম, মাতঙ্গিনী'দের মত স্বাধীনতা সংগ্রামী, শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণের মত যুগাবতার, বীর সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ,ঋষি অরবিন্দ'র মত যুগপ্রবর্তক, সাধক বামাক্ষ্যাপা, সাধক রামপ্রসাদ, ত্রৈলঙ্গস্বামী'র মত সাধক, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ-এর মত কবি, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়-এর মত সমাজ সংস্কারক, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র বসু, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বস-র মত বিজ্ঞানী, সলিল চৌধুরী, হেমন্ত চট্টোপাধ্যায়, পঙ্কজ মল্লিক, নচিকেতা ঘোষ-এর মত সুরস্রষ্টা, উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, উৎপল দত্ত-এর মত অভিনয়শিল্পী, --- আরো কত স্বদেশখ্যাত, বিশ্ববিখ্যাত মানব এই মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তাঁদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলা'কে বিশ্ব মানচিত্রে একটা পরিচিতি দিয়েছেন।

নতুন বছর হৃদয়ে নতুন আশার দিশা দেয় - "নতুন" শব্দটার মধ্যেই কেমন একটা positivity আছে। নতুন বই, নতুন জামা, নতুন আসবাব, নতুন বাড়ি, নতুন গাড়ি, এমনকি নতুন জীবন – যখনি “নতুন” শব্দ কোনও শব্দের আগে বসেছে, তখনই একটা উৎসাহ মনের মধ্যে উঁকি দিয়েছে – এগিয়ে চলার বার্তা দিয়েছে। আমরাও, তাই নতুন বছরে পদার্পণ করে, জীবনের উদ্দেশ্য পূরণে, নতুন উদ্যমে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে চলবো – এই হোক আমাদের সম্মিলিত শপথ। “সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে” – এই উদ্দেশ্যেই জীবন আবর্তিত হোক –
ওঁ সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ,
সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ।
সর্বে ভদ্রাণি পশ্যন্তু,
মা কশ্চিদ্ দুঃখ ভাগভবেৎ।।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ
"
--- বৃহদারণ্যক উপনিষদ-এর এই মহামন্ত্র সকলের জীবনেই প্রতিষ্ঠিত হোক, এই প্রার্থণা করি।

নতুন বছরের প্রতিটি দিন প্রত্যেকের জীবনে আনন্দের বার্তা বয়ে আনুক এই শুভেচ্ছা এবং প্রার্থণা রইলো। পুরনো বছরের অনেক স্মৃতি সুখ-স্মৃতি হয়ে থাকে আবার অনেক স্মৃতি দুঃখেরও হয়। কিছু হারানোর ব্যথা, কাঊকে হারানোর দুঃখ, কিছু সংগ্রামের আকস্মিকতা – এইগুলি যদি একজনের জীবনকে চিরন্তন সত্যের মুখোমুখি ফেলে কঠিন সত্যে প্রতিষ্ঠিত করে, তবে কিছু মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া, কিছু নতুন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিচিত এবং যুক্ত হওয়া – এইগুলি একজনের জীবনকে নতুন রঙে রাঙিয়ে দেয়। তেমনি এই ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রতিটি দিন প্রত্যেকের জীবন নতুন নতুন রঙে রেঙে উঠুক – এই প্রার্থণা করি।

সকলের জয় হোক!!

২০১৭ সালের নববর্ষের বার্তা-র লিঙ্ক নীচে দেওয়া থাকলো :)
https://subhendumaity.blogspot.com/2017/04/blog-post.html